লাশের পাহারাদার
হঠাৎ করেই আবিষ্কার করলাম, আমার পাশে কেউ শুয়ে আছে। তার হাত-পা একেবারে ঠান্ডা, জমে যাওয়া বরফের মতো। বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল। চোখ কচলিয়ে দেখলাম, না, কোনো স্বপ্ন নয়—এটা বাস্তব।
এরকম পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে, তা কখনো ভাবিনি। এই লাশ এখানে এল কীভাবে? আমি তো ঘুমিয়েছিলাম একা, কিন্তু এখন আমার পাশে শুয়ে আছে একটা নিথর দেহ।
শরীরটা আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল। কী করবো? একটু কবিরাজকে খবর দিই? না ডাক্তারকে ডাকবো? নাহ, পুলিশকে খবর দেওয়া দরকার!
ঠিক তখনই দরজায় কে যেন টকটক করে টোকা দিল। বুকের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। আস্তে করে উঠে দরজা খুললাম। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে দেখি আরেকজন আমার সামনে ধপ করে পড়ে গেল!
ভয়ে পিছিয়ে গেলাম।
— "ভাই, আপনার কি হয়েছে?"
কোনো সাড়া নেই। হাত বাড়িয়ে তার শরীরে স্পর্শ করতেই শিউরে উঠলাম—এই লোকটারও হাত-পা একেবারে ঠান্ডা!
এইবার আমার হাত-পা কাঁপতে লাগল। সারা শরীর ঠান্ডা ঘামে ভিজে গেল। আমি চিৎকার করে উঠলাম,
— "কেউ আছেন? আমাকে বাঁচান! আমাকে বাঁচান!"
চারপাশ শুনশান নীরব। শুধু বাতাসের হালকা শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমার কণ্ঠ যেন আমার কাছেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
ঘুমটা ভেঙে গেল।
চোখ খুলে দেখি, আমি সেই পুরনো জায়গাতেই আছি। ঘরের এক কোণে লাশ শায়িত। অন্ধকারে ঝাপসা দেখা যাচ্ছে, আরও একটা লাশ এনে রাখা হচ্ছে।
কত বছর হয়ে গেল? কত লাশ জমা হয়েছে? কেউ কি এই লাশগুলোর দাবি নিয়ে আসে? না, কেউ আসে না।
মানুষ যতদিন জীবিত থাকে, তার পাশে হাজারো মানুষের ভিড়। অথচ সে মারা গেলে, সবাই তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। স্বার্থের শেষ মানেই সম্পর্কের সমাপ্তি।
কেউ এগিয়ে আসে না এই লাশগুলো দাফন করতে। যার পাশে কেউ নেই, আমি তার পাশে আছি। অথচ, আমার এই পাশে থাকাটা তার জীবনের কোনো অংশ নয়। সে কিছুই অনুভব করে না, আমার উপস্থিতি তার জন্য কোনো অর্থ বহন করে না।
কখনো কখনো মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে, "লাশ পাহারা দেওয়া—এটাও কি একটা কাজ?"
একটা সময় ছিল, যখন এই কাজ করতে গিয়ে ভয় লাগত। এখন ভয় কেটে গেছে। এখন মনে হয়, আমি তো কেবল সময়ের অপেক্ষায় আছি। হয়তো একদিন এই লাশের মিছিলে আমার লাশেরও ঠাঁই হবে।
এই কাজ থেকে বিরতি দরকার। প্রতিটি লাশ দাফনে যাদের কর্তব্য রয়েছে, তারা যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করত, তাহলে আমার এই পাহারাদারি করা লাগত না।
একদিন হয়তো আমার পালাও আসবে। তখন হয়তো আমার পাশেও কেউ থাকবে না, যেমন আজকের এই লাশগুলোর পাশে কেউ নেই। আমি শুধু চাই, সেদিন যেন কেউ এসে আমার নিথর শরীরটা মাটির নিচে নামিয়ে দেয়। যেন আমার লাশটাও পড়ে না থাকে নিঃসঙ্গ, দাবিহীন হয়ে...
No comments